ক বি- শি ল্পী শ্যা ম ল জা না
শ্যামল জানা
জন্ম:-৭ নভেম্বর,১৯৫৭, বরানগরে৷ প্রাথমিকভাবে ইঞ্জিনীয়ারিং-এর ছাত্র৷ পরে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভিসুয়াল আর্টস-এ (ইউরোপীয় চিত্রকলা) স্নাতকোত্তর৷ মূলত ফাইন আর্টস-এর ছাত্র হলেও ছবি আঁকার পাশাপাশি প্রচ্ছদ ও অলংকরণশিল্পী হিসেবেও সুপরিচিত৷ কলকাতা ছাড়াও ভারতবর্ষের মূল শহর - গুলিতেও বহু জাতীয়স্তরে চিত্র-প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন৷ আন্তর্জাতিকস্তরেও ডিজিটাল গ্রাফিক্স-এর প্রদর্শনীতে সুদূর লাতিন আমেরিকায় ভেনেজুয়েলায় অংশগ্রহণ করেছেন।ডিজিটাল প্রযুক্তিকে একশো শতাংশ ক্রিয়েটিভ আর্টের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা ও তাকে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে পশ্চিমবমবঙ্গে প্রথম “ডিজিটাল গ্রাফিক্স”-এর সূত্রপাত করেন তিনি৷ পশ্চিমবঙ্গে প্রথম সাড়া জাগানো “ডিজিটাল গ্রাফিক্স”-এর প্রদর্শনীও করেন৷ সেই সূত্রে এবং সাহিত্যসূত্রে তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকার তথা ভারত সরকার-এর প্রতিনিধি হয়ে গেছিলেন সুদূর সাউথ আফ্রিকায়, লাতিন আমেরিকার একাধিক জায়গায় আন্তর্জাতিক সেমিনারে।একক ও যৌথভাবে সরকারি ও বেসরকারি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট্রি ফিল্ম করেছেন৷প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :-ক্রোধের মুখ রোদের মতো (১৯৯২),কয়েকটি কবিতা (১৯৯৫),কুয়াশা নামক মেয়েটিকে (২০০১),ভুল (২০০৬),এক ঠিকানায় (২০০৭-যৌথ),টিপছাপ (২০০৭), ভ্রমণ সিরিজ (২০১০),মিঠিকথা (২০১৬), টিপছাপ-২ (২০২০)৷সম্পাদিত গ্রন্থ – সাহিত্য দৃশ্যকলা এবং (চিত্রকলা বিষয়ক),সুনীল সাগরে (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় স্মরণে কবিতা সংকলন - যৌথভাবে) পুরস্কার:– বাল্মিকী পুরস্কার, কিশোর দুনিয়া পুরস্কার, নিত্যানন্দ স্মৃতি পুরস্কার, বাংলা কবিতা অকাদেমি সম্মাননা, ইসক্রা সম্মাননা, শালিমার চিল্ড্রেন ডিটেকটিভ পুরস্কার, এখন রোদ্দুর নির্মল ব্যানার্জী স্মৃতি পুরস্কার প্রভৃতি।
©কবির সঙ্গে কবিতার সঙ্গে
একটা কবিতার কথা মাঝে মাঝেই মনে পড়ে। আপনা থেকেই। কোনো অনুষঙ্গ ছাড়াই। কবিতাটি হল—
সাহস ও ধৈর্য
সাহস ধৈর্যকে পরাজিত করে…
ধৈর্যের চেয়ে কি সাহসের বেশি প্রয়োজন ?
নাকি সাহসের চেয়ে ধৈর্য!
এই প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে গিয়ে
কখনো সাহস হারিয়ে ফেলি
কখনো ধৈর্য।
এই কবিতাটি শোনার পর থেকে আমি খুবই সমস্যায় পড়েছি। দৈনন্দিন জীবনে কোনো কাজ করতে গেলে, রোজই, প্রতি মুহূর্তেই, এই কবিতাটি স্মৃতির দরজা ঠেলে মুখ বাড়ায়। আর আমাকে ধমকায়। কী রকম?
ধরা যাক রাতে খুব ঘুম পেয়েছে। তাড়াতাড়ি মশারির দড়ি খাটাতে গিয়ে পেরেকটা খুলে গেল। আবার, দেওয়ালে পেরেকটা তখনই মারা দরকার! এদিকে খুব ঘুম পেয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই হাতুড়িটা ঠুকঠুক করে না মেরে সজোরে মারলাম পেরেকটার ওপরে। ঠিকমতো না লেগে লাগল আঙুলে। রক্তারক্তি! আর ঘুম গেল চটকে! কবিতাটি অমনি স্মৃতির দরজা ঠেলে মুখ বাড়াল। বলল— তুই ধৈর্য হারিয়ে ফেললি কেন? এখানে সাহসের চেয়ে বেশি দরকার ছিল ধৈর্যের।
আবার, সেদিন অফিস যাব। রাস্তা পেরিয়ে উল্টোদিক থেকে বাস ধরতে হবে। রাস্তার দুদিক থেকেই গাড়ি যাচ্ছে আসছে। বুঝতে পারছি খুব দেরি হয়ে যাচ্ছে, অফিসে লেট হয়ে যাবে, তাও ধৈর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আচ্ছি রিস্ক হয়ে যাবে ভেবে। তখনই পাশের বাড়ির ছেলেটা এল। বলল— কাকু রাস্তা পার হতে পারছো না? বললাম— হ্যঁ রে বাবা, ভয় করছে। ছেলেটা বলল— সাহস করে রাস্তা পার হতে হবে কাকু, ভয় পেলে চলবে না। বলে, আমার হাত ধরে স্যুট করে রাস্তা পার করিয়ে দিল। বুঝলাম, এখানে ধৈর্য নয় সাহসের প্রয়োজন!
এভাবে সারাদিনই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকি— কখন সাহস দেখাব আর কখন ধৈর্য ধরব?
এ তুমি কী করলে বলোতো বন্ধু আমার?
আমার এই বন্ধুটির নাম— মাহমুদ কামাল। এরই লেখা ওপরের এই
‘সাহস ও ধৈর্য ’ নামের কবিতাটি। কামাল আমার আক্ষরিক অর্থেই বন্ধু। বন্ধু মানে প্রথমে কবিতাবন্ধু, পরে সম্পর্ক গাঢ় হলে সার্বিকভাবে হৃদয়বন্ধু। আমার সাথে তার পরিচয়ের সূত্র এই অর্থে যে, আমার কবিতা তার ভালো লাগে। বাংলাদেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও ব্যপ্ত যে কবিতা উৎসবটি টাঙ্গাইলে ধুমধাম করে পালিত হয়, দু-বছর অন্তর। সেটির দণ্ডমুণ্ডের কর্তা এই মাহমুদ কামাল। সেখানে সে আমাকে আন্তরিক নিমন্ত্রণ করে। কারও ভায়া নয়, সরাসরি। তিনদিন তার আতিথেয়তায় কবিতানিমজ্জিত হয়ে থাকি। সে এক অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতা।
আমি সীমান্ত মানি না। একই বাংলাভাষায় কথা বলা দুজন মানুষের আলাদা আলাদা দুটো দেশ, এ আমি কোনোভাবেই মানতে পারি না। কোনো অর্থেই। তাই, কামালভাইকে কখনও অন্য দেশের মানুষ মনে হয়নি। কখনও মনে হয়নি অন্য জাত। আসলে, দুজন মানুষের মধ্যে মনের আদান-প্রদান ঘটে একমাত্র ভাষার সাহায্যে। সেখানে যদি ভাষা এক হয় এবং সেই সাথে যদি মেন্টাল ফ্রিকোয়েন্সিও মিলে যায়, তাহলে বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে কোনো বাধাই বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। এটাই স্বাভাবিক। আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এবং এখানে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে কবিতা। আমরা দুজনেই দুজনের কবিতা পছন্দ করি।
আমার কবিতা কামাল কেন পছন্দ করে সে প্রসঙ্গ এখানে আনছি না। কিন্তু কামালের কবিতা আমি অসম্ভব পছন্দ করি। তার একাধিক কারণ আছে। প্রথমত— কামালের কবিতা-উচ্চারণ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। একেবারেই নিজস্ব। দ্বিতীয়ত—সে অত্যন্ত সৎ এবং সরল মানুষ। অথচ বুদ্ধিমান ও উচ্চশিক্ষিত। এই রকম কম্বিনেশন সাধারণত হয় না। কিন্ত কামালের ক্ষেত্রে এটা ঘটেছে। আজকে দুই বাংলা মিলিয়ে কবিতায় মাহমুদ কামাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। কেন? সে অত্যন্ত সৎ বলে তার হৃদয়ানুভবই সরাসরি কবিতায় রূপান্তরিত হয়। মাঝখানে কোনো কৌশলজনিত নির্মাণ থাকে না। তাই, আমরা কামালের কবিতায় লক্ষ করেছি, কোনো কষ্টকল্পিত চিত্রকল্প নেই।
প্রাচীন দার্শনিকেরা বলেন— সরল এবং একই সাথে বুদ্ধিমান হন যে মানুষ, সেই সবচেয়ে বেশি প্রকৃতিকে অনুধাবন করার ক্ষমতা রাখেন। বিশেষ করে দৈনন্দিন জীবনের যে সব ছোটোখাটো ঘটনা ঘটে, তার থেকেও তাঁরা দর্শন খুঁজে পান। আমার এই বিশুদ্ধ বন্ধু, মাহমুদ কামালের কবিতা ঠিক এই রকম। এই ২০২২-এ সদ্য প্রকাশিত তার কবিতার বইটির নাম— ‘গোপনেরও সৌন্দর্য আছে'। এই নামের যে কবিতাটি, সেটি হল—
গোপনেরও সৌন্দর্য আছে
গোপন প্রকাশ্য হলে
আলোকের দ্যুতি কমে যায়
গোপনের ঘরে গোপনকেই
রেখে দেয়া ভালো
গোপনেরও সৌন্দর্য আছে
শিল্পের সকল সংজ্ঞা
শুধুমাত্র প্রকাশে মেলে না
অপ্রকাশও জীবনের সৌন্দর্য প্রতীক।
আমি এই কবিতাটি যখন প্রথম পড়ি, যার পর নাই বিস্মিত হয়েছিলাম। কারণ, আমার আর্ট কলেজের একটি থিওরি ক্লাসের কথা মনে পড়ে গেছিল। আমরা তখন সবে আর্ট কলেজে ঢুকেছি। ফার্স্ট ইয়ার। প্রথম কম্পোজিশনের ক্লাস হচ্ছে। অনেকগুলো কম্পোজিশনের বিজ্ঞান সেদিন আমাদের বোঝানো হয়েছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটি, সেটি ছিল চিনা শিল্পবিদদের। তাঁরা বলছেন— কাগজে বা ক্যানভাসে ছবি আঁকার সময় কতটা আঁকব, এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল— কতটা আঁকব না। সৌন্দর্যের আসল চাবিকাটি হল ওটাই। ছবি আঁকার সময় কতটা প্রকাশ করব, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি মেধা লাগে, কতটা প্রকাশ করব না, গোপন রাখব, সেটা ভাবতে। আর, এই ভাবনাটা যে যত ভালো ভাবতে পারবে, সে তত বড় শিল্পী হতে পারবে। কামালের এই কবিতাটি যেন হুবহু সেই কথাই বলছে। আমি নিশ্চিত যে কামাল এই কথা সম্পূর্ণ তার নিজস্ব উপলব্ধি থেকে, দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে, বলেছে। কোনো চিনা শিল্পতত্ত্ববিদের দর্শন ধার করে নয়। আসলে, উপলব্ধি সঠিক হলে তা থিওরির সঙ্গে মিলে যায়।
যেমন তার প্রথম কবিতাটাই (‘’সাহস ও ধৈর্য ’’) যদি ধরি, একে যদি অ্যাকাডমিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করি, তাহলে দেখব— এটি একটি আক্ষরিক অর্থে সম্পূ্র্ণ পোস্ট মডার্ন কবিতা হয়েছে। আমরা জানি— পোস্ট মর্ডানের মূল সূত্র হচ্ছে— সবই আপেক্ষিক। নির্দিষ্ট সত্য বলে কিছু হয় না। ইংরাজিতে বললে— Truth নয় truths.। সত্য নির্মিত হয় অবস্থা বা পরিস্থিতির (Condition) প্রেক্ষিতে, যা আগে থেকে নির্দিষ্ট করে রাখা যায় না। আমি একটু আগে আমার ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দুটি ঘটনা বর্ণনা করেছি, যেখানে একটিতে ধৈর্য নয় সাহসের প্রয়োজন বেশি ছিল। আর, আর একটিতে সাহস নয় ধৈর্যের প্রয়োজন বেশি ছিল। তাতে আমরা খুব স্পষ্টভাবেই ধারণা করতে পেরেছি যে, কোন্ সময়ে কোনটার প্রয়োজন হবে। এটা আগে থেকে ঠিক করা সম্ভব নয় কোনোমতেই। এটিই পোস্ট মর্ডানের মূল সূত্র। যা সার্থকভাবে এই কবিতায় মাত্র ছয় পংক্তিতে মাহমুদ কামাল প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে।
যেহেতু মাহমুদ কামালের ‘’গোপনেরও সৌন্দর্য আছে” কবিতার বইটি এখনও পর্যন্ত সর্বশেষ বেরিয়েছে, তাই, এই বইটি থেকেই আমি উদাহরণগুলি দিচ্ছি। আসলে ও যত কবিতা লিখেছে, তার পুরোটাই যদি পরিক্রমা করি, তাহলে দেখব— ওর অধিকাংশ কবিতাই পোস্ট মডার্ন-এর আওতায় পড়ে।
এরকমও হয়েছে— সরাসরি না গিয়ে একটি পুরোনো দর্শনকে সূত্র করে পৌঁছেছে পোস্ট মডার্নে। যেমন ‘’ঈশ্বর ও মানুষ” কবিতাটি—
‘’ঈশ্বর ও মানুষ”
আয়নায় কাকে দেখি!
আমি এক মূর্ত শয়তান
প্রতিবিম্বে ভেসে ওঠে
ঈশ্বরের ছবি
আয়না ভেঙে গেলে
ভাঙা কাঁচে ঈশ্বর ও শয়তান
পরস্পর খুনসুটি করে
পরাজিত নয় কেউ…
এর পর ধূর্ত শয়তান
এই আমি মানুষ হয়ে উঠি।
এই অসম্ভব কবিতাটি কামাল কী করে যে লিখল, তা ভেবে আশ্চর্য হই! প্রথম চারটে পংক্তিতে সে কী আশ্চর্য মেধার পরিচয় দিয়েছে আশাকরি পাঠক বুঝতে পারছেন।
“আয়নায় কাকে দেখি! / আমি এক মূর্ত শয়তান “ একদম প্রথমে কামাল এই পংক্তিদুটি লিখেছে। অর্থাৎ, আমি যখন নিভৃতে আয়নায় নিজেই নিজের মুখ দেখি, তখন যেহেতু, নিজেকে নিজে মিথ্যা বলা যায় না, নিজের সাথে নিজে ভান করা যায় না, অভিনয় করা যায় না, তাই স্পষ্ট বুঝতে পারি— আমি এক মূর্ত শয়তান। তখন আমি নিজেই নিজের মূল্যায়ন করি, তখন আমি নিজেই সরাসরি নিজেকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি, বিবেক ও বোধ জাগ্রত করে নিজেকে নিজে বিশ্লেষণ করি, তাই, তখন টেরই পাওয়া যায় না এটা আমার প্রতিবিম্ব। মনে হয়, বাইরের আমি আর আয়নার আমি দুজনেই সত্য, দুজনেই আসল।
আবার, পরের দুটি পংক্তিতে সে লিখছে— “প্রতিবিম্বে ভেসে ওঠে / ঈশ্বরের ছবি “। অর্থাৎ, আমি যখন প্রকাশ্যে আসি, তখন আয়নায় ছায়া পড়লে তেমনভাবে দেখি না, অন্যেরা দেখে। তখন ওটিই যে আক্ষরিক অর্থে প্রতিবিম্ব, তা স্পষ্ট বুঝতে পারি। তখন আমি প্রকাশ্যে অন্যদের সঙ্গে খুব ভালো মানুষের মতো আচরণ করি। নিজের খারাপ দিকগুলি সচেতনভাবে গোপন রাখি, যেন তারা ভেবে নেয় আমি ঈশ্বরের মতো মানুষ! যেন আমার সেই প্রতিবিম্বটি ঈশ্বরের! “ প্রতিবিম্ব ”-র এই ক্ল্যাসিক্যাল প্রয়োগ সত্যিই আমাদের বিস্মিত করে!
সেই পুরোনো দর্শন, যাকে আমরা হেগেলিয় দর্শন হিসেবে জানি— “ থিসিস অ্যান্টিথিসিস সিনথেসিস ”। যে, কোনো মানুষই সম্পূর্ণ খারাপ বা সম্পূর্ণ ভালো হয় না। তার ভেতরে “সু” এবং “কু” এই দুটো মানুষই একই সাথে বাস করে। যাকে কামাল “ঈশ্বর “ ও “শয়তান “ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এরা কেউ কাউকে একেবারে পরাজিত করতে পারে না! প্রথম চারটে পংক্তির কথা আমরা বলেছি। তার পরের চারটে পংক্তিতে সে ঠিক এই দর্শনই তুলে ধরেছে—
“আয়না ভেঙে গেলে / ভাঙা কাঁচে ঈশ্বর ও শয়তান / পরস্পর খুনসুটি করে / পরাজিত নয় কেউ...”।
এর পরে কামাল আরও দুটি পংক্তি লিখে কবিতাটি শেষ করল। যে দুটি পংক্তিকে আমরা নিশ্চিত উপসংহার হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি—
“এর পর ধূর্ত শয়তান / এই আমি মানুষ হয়ে উঠি।“
এই কবিতায় “আমি” আসলে সমস্ত মানুষের প্রতীক। সব মানুষই আসলে কখনো শয়তান, কখনো মানুষ। অর্থাৎ কামাল একেবারে শেষে পোস্ট মডার্ন-এ এসে থামল— যে, কোনো মানুষকে নির্দিষ্ট সত্যে চিহ্নিতকরণ করা যায় না। শয়তান এবং মানুষ এই দুটি সত্তাই সে বহন করে। সময় বিশেষে আমরা তা টের পাই।
আসলে, বন্ধু মাহমুদ কামাল-এর কবিতার উচ্চারণ এত স্বতন্ত্র যে মনে হয় তার সব কবিতাই এইভাবে আলোচনা করি। কিন্তু, এই স্বল্প পরিসরে তা সম্ভব নয়।
আমরা চার বন্ধু এই গত মাসেই একসঙ্গে তিনদিন কাটিয়ছি— এই তিনদিন ধরে থাকা খাওয়া শোওয়া বা রাত কাটানো ঘোরা আলোচনা করা, সর্বোপরি কবিতায় পূর্ণ নিমজ্জিত থাকা তিনদিন ধরে..., সে এক অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতা! আমরা মানে বাংলাদেশের পাবনা জেলার উল্লেখযোগ্য কবি ও প্রাবন্ধিক মজিদ মাহমুদ-এর আতিথেয়তায় তার পাবনা জেলার ওসাকা বিল্ডিং-এর গেস্ট হাউসে আমি, বাংলাদেশের আর এক উল্লেখযোগ্য কবি ও গদ্যকার ময়মনসিংহের ফরিদ আহমেদ দুলাল ও আমার এই বন্ধু টাঙ্গাইলের মাহমুদ কামাল।
কথায় বলে— একসঙ্গে রাত না কাটালে কোনো মানুষকে সঠিক চেনা যায় না। কথাটা কী যে সত্যি, এই তিনদিনে তা উপলব্ধি করতে পেরেছি। স্বল্পবাক, ধীশক্তিসম্পন্ন মানুষ এই মাহমুদ কামাল। কী সাংঘাতিক স্ম়ৃতিশক্তি! আর তেমন বড় সংগঠক! দুই বাংলার কবি-সাহিত্যিকদের সে চেনে একেবারে নখ-দর্পণে! আর তেমনি সঠিক মূল্যায়ন। আর স্পষ্টভাষী সৎ ও নিরহংকার।
আরও একটা অদ্ভুত ব্যাপারে আমরা পরস্পর পরস্পরের প্রতি দূর্বল। ।যার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই, শুধুই আবেগ! সেটি হল— আমরা প্রায় একেবারে সমবয়সী। কামালের জন্ম ২৩ অক্টোবর ১৯৫৭, আর আমার জন্ম ৭ নভেম্বর ১৯৫৭ । মাত্র ১৫ দিনের বড় কামাল আমার চেয়ে।
আমি সত্যিই ভাগ্যবান এবং গর্বিত এই রকম একজন বন্ধু পেয়ে।


কী অসাধারণ ভালোবাসা-বাসি বন্ধুতে বন্ধুতে! কবি মাহমুদ কামালের কবিতার মত আপনার গদ্যেও কত কথা বলে যাচ্ছে, আরো না বলা কথায়!
ReplyDeleteআশির দশকের উল্লেখযোগ্য কবি মাহমুদ কামাল সম্পর্কে নিরাভরণ, সহজশব্দচয়িত, বন্ধুগাঁথাময় কবিতার আলোচনাটি পড়লাম। আমার সৌভাগ্য হচ্ছে, আলোচিত কবি মাহমুদ কামাল এবং আলোচক কবি-শিল্পী শ্যামল জানা দু'জনকেই চিনি। আমাদের সমস্ত সৃষ্টিশীলতা এর জন্য গর্ব-অহঙ্কারের উর্ধ্বে কী করে মানুষ হিসাবে সহজ, সরল, কন্টকতামুক্ত জীবন পরিচালনা করা যায়, তা এই ষাটোর্ধ্ব দুই সৃজনশীলের কাছ তেকে শেখার মতো। এ আলোচনায় কবিকে যথাযথ সুবিচার করে তুলে এনেছেন কবি শ্যামল জানা। তাকে সাধুবাদ দিয়ে খাটো করতে চাই না। কবি মাহমুদ কামালের কাব্যখ্যাতি আরো বিস্তৃত হোক, এই প্রত্যাশা।
ReplyDeleteউত্তর-আধুনিক সৃজন-বিন্যাসই তো ক্রমান্বয়ী কবিতালাপের অনুধ্যানে আজ ! মননের আলপনায় এমন অনুভবেরই আভরণ আমার। কবি মাহমুদ কামালও অবলীলায় সময়ের চারু-সবুজের এমন বিন্যাসকে ধারণ করেছেন। কবিতা-সৃজন আর কবি-সত্যায়নের অন্তরতর এবং কষ্ট-মাধুর্যমণ্ডিত কার্যকর কনকের সন্ধানই তিনি করেন। কবি শ্যামল জানার প্রাণ-মধ্যমায় এমন সত্যই সঞ্জীবিত। তাঁর প্রত্যয়, তাঁর বাসনা আয়ু-চর্চার বিনম্র বৃত্তকে আত্মঃস্থ করেই মাহমুদ কামালের কবিতাকে সম্ভূষিত করেছে। প্রক্রিয়াটি মনোমোহন এবং উপভোগ-সমুত্থিত। তিনি মাহমুদ কামালের কবিতাশৈলী আর বিষয়কান্তির মনোরম পরাগ সর্বজনীন রূপমূর্তিকে বিশেষায়িত করেছেন এমন ক্রিয়াত্মক প্রজ্ঞাপন-তত্ত্বাবধানেই। শ্যামল জানা সনিষ্ঠ মনন-চিত্রায়নেরই অধিকার-সংবাহক। অখণ্ড-অক্ষয় মাহমুদ কামালের কবিত্ব-সম্পোষণার জ্যোতি তাঁর সৌহার্দ্য-সংরাগের আবহেই হয়ে উঠেছে ধীমান-সুন্দর !
ReplyDeleteThis comment has been removed by the author.
Deleteউত্তর-আধুনিক সৃজন-বিন্যাসই তো ক্রমান্বয়ী কবিতালাপের অনুধ্যানে আজ ! মননের আলপনায় এমন অনুভবেরই আভরণ আমার। কবি মাহমুদ কামালও অবলীলায় সময়ের চারু-সবুজের এমন বিন্যাসকে ধারণ করেছেন। কবিতা-সৃজন আর কবি-সত্যায়নের অন্তরতর এবং কষ্ট-মাধুর্যমণ্ডিত কার্যকর কনকের সন্ধানই তিনি করেন। কবি শ্যামল জানার প্রাণ-মধ্যমায় এমন সত্যই সঞ্জীবিত। তাঁর প্রত্যয়, তাঁর বাসনা আয়ু-চর্চার বিনম্র বৃত্তকে আত্মঃস্থ করেই মাহমুদ কামালের কবিতাকে সম্ভূষিত করেছে। প্রক্রিয়াটি মনোমোহন এবং উপভোগ-সমুত্থিত। তিনি মাহমুদ কামালের কবিতাশৈলী, বিষয়কান্তির মনোরম পরাগ এবং সর্বজনীন রূপমূর্তিকে বিশেষায়িত করেছেন এমন ক্রিয়াত্মক প্রজ্ঞাপন-তত্ত্বাবধানেই। শ্যামল জানা সনিষ্ঠ মনন-চিত্রায়নেরই অধিকার-সংবাহক। অখণ্ড-অক্ষয় মাহমুদ কামালের কবিত্ব-সম্পোষণার জ্যোতি তাঁর সৌহার্দ্য-সংরাগের আবহেই হয়ে উঠেছে ধীমান-সুন্দর !
ReplyDelete