স ম্পা দ কে র জা না লা
দুর্গাদাস মিদ্যা
জন্ম:-১৫ আগষ্ট, ১৯৪৭।
বাঁকুড়া জেলার গন্ডগ্রাম গেঙ্গারীতে। শিক্ষা-স্নাতক স্তর পর্যন্ত।পেশা ব্যাঙ্ক আধিকারিক। বিগত পঁচিশ বছর আরাত্রিক পত্রিকা প্রকাশনার কাজে যুক্ত সম্পাদক হিসেবে।শুধুমাত্র লিটল ম্যাগাজিনের সেবক। নানা পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছি। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাহিত্য লহমা পুরস্কার। ২) শ্লোক পত্রিকার রজত জয়ন্তী পুরস্কার। ৩) মেটেফুল ছোট পত্রিকা পুরস্কার ৪) লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র সম্মান।
সম্পাদকের জানালা@
এ সংখ্যার জন্য মনোনীত সম্পাদক হলেন 'আরাত্রিক' পত্রিকার সম্পাদক দুর্গাদাস মিদ্যা
জানালা খোলার দায়িত্ব অনেক, ঝড় বৃষ্টির ঝাপটাও আসে....
জানালা খোলা থাকলে হাওয়া আসে, রোদ আসে, মনের জানালা খোলা থাকলে মন-খোরাকের রোদ আসে, হাওয়া আসে। ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে আসে। এটা আমরা সকলেই জানি। লিটল ম্যাগাজিন করার পরিকল্পনা আসে আমাদের বাড়ির পরিবেশ থেকে। আমাদের বাড়িতে সাংস্কৃতিক চর্চাটায় বেশ জোর ছিল। দরিদ্র ছিলাম অর্থনৈতিকভাবে । কিন্তু পড়াশোনার পক্ষে ছিল আমাদের সকলের জীবন। আমাদের বাড়িতে নানারকমের বিখ্যাত সব পত্র-পত্রিকা নিয়মিত আসতো। বাবা নিতেন এবং পড়তেন। বাবার দেখাদেখি আমরাও-অর্থাৎ ভাই-বোনেরাও ওই সমস্ত পত্র-পত্রিকা পড়তাম। আমাদের জন্য আসতো-শিশু সাথী। শুকতারা প্রভৃতি। পড়তে পড়তে লেখার ইচ্ছাও জেগে উঠেছিল বইকি! ১৯৭০-৭১-এর যুদ্ধ আমাকে সবিশেষ উদ্বুদ্ধ করেছিল, ফলে বেশ কয়েকটা কবিতা লিখে ফেলি। এইভাবে লেখার ভাবনা মাথায় নিয়ে একদিন ব্যাঙ্কের কাজে যোগ দিলাম। চাকরিতে এসেও পোকা মাথায় নড়চড় করতেই থাকলো। এই পোকা একবার ঢুকলে তখনই বের হয় যখন কলমের কালো কালো অক্ষরে বেরিয়ে আসে।
বাঁকুড়ার নুনগোলা রোডে ইউনাইটেড (যা অধুনা পাঞ্জাব ন্যাশানাল ব্যাঙ্কে আগ্রাসনে লুপ্ত) ব্যাঙ্ক সেই শাখায় আমরা কজনা একটি দেওয়াল ম্যাগাজিন চালু করেছিলাম। সেই দেওয়াল ম্যাগাজিনে আমার একটি কবিতা ছিল শিরোনাম ছিল-মৃত্যু তুমি সুন্দর। আমার সৌভাগ্য ছিল যে সেই সময়ের বিখ্যাত কবি প্রয়াত আনন্দ বাগচী মহাশয় আমাদের এই শাখার একজন গ্রাহক ছিলেন। তিনি তখন বাঁকুড়া ক্রিশ্চান কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান। ঘটনাক্রমে আমিও ক্রিশ্চান কলেজের ছাত্র ছিলাম। উনি ওই কবিতা পড়ে খুব সাধুবাদ দিয়েছিলেন। তখন থেকেই মনোরাজ্যে কাব্যশিল্পের সূচী বুনন। এরপর নানা ঘাটে জল খেতে খেতে গঙ্গাপারে এসে পড়া। ইউ.বি.আই-এর চেতলা শাখায় ডেপুটি ম্যানেজার। কাজের শেষে বাড়ি ফিরে আসা নীড়ে ফেরা পাখির মতন। সন্তোষপুর, বিধানগড়ে। যেখানে-‘আবাদ' পত্রিকা প্রকাশ করতেন -কৃষ্ণা মজুমদার।সেখানে আমার স্বরচিত কবিতার আত্মপ্রকাশ হয়। অর্থাৎ কলকাতায় এসে জানালা খোলা হল। এখানেই দেখা হল কবি অর্দ্ধেন্দু চক্রবর্তীর সঙ্গে। মাঝে মাঝে কবিতার আড্ডায় যোগদান এবং বিধানগড়ের ফ্ল্যাটে-কবিতাগল্পের নানা অনুষ্ঠান। আমার স্ত্রী ডলিও গল্প লিখতে লাগলো।আলোচনায় অংশগ্রহণ করে আনন্দ পেতে থাকলো। জানালার আলো আর তখন তেরছা নেই সোজা পড়ার টেবিলে এসে পড়লে।এখানে একটা কথা বলে রাখি আমরা নিঃসন্তান।একদিন এক বাড়ির সভায় উপস্থিত ছিলেন কবি বিশ্বজিৎ রায়, বিশিষ্ট গল্পলেখক তন্ময় মজুমদার আমি এবং ডলি। আলোচনা হতে হতে আলোচনার মোড় ঘুরে গেল।
ডলি(বসুশ্রী মিথ্যা) বলে বসল-একটা লিটল ম্যাগাজিন বার করা যায় না। এর সমস্ত খরচ আমাদের শুনে স্তস্তিত হতে তখনো দেরি, তা হল টাকার কথা ভাববেন না। ছেলে অথবা মেয়ে থাকলে তার তো একটা খরচ থাকতো। তা যখন নেই তখন ওই লিটল ম্যাগাজিনই আমাদের সন্তানরূপে পালিত হবে। কী রাজি আছেন তো! আমরা সকলেই বেশ হতবাক। সামান্য সময় কেটে গেল নীরবতায়। তারপর হো হো হেসে ওঠা। বউ ডলির এহেন প্রস্তাবে আমাদের মধ্যে পরিকল্পনার আগুন জ্বলে উঠলো।
ভাবনার গাড়ি গড়গড়িয়ে এগিয়ে চলল।ঘরে একটি সভার ব্যবস্থা হল সেখানে তন্ময় মজুমদার-এর পরিচিত প্রবালকুমার বসু বিশিষ্ট কবি এবং কবি অনীক রুদ্র উপস্থিত ছিলেন আর ছিলাম, আমি ডলি এবং তন্ময়দা। পত্রিকার নামকরণ ঠিক হল-আরাত্রিক। লেখা জোগাড়ের দায়িত্ব নিলেন-প্রবাল। পত্রিকার প্রকাশ ঘটে
-শুক্লা পঞ্চমী ১৪০৪। প্রথম আলোর মুখ দেখল-আরাত্রিক। “আরাত্রিক” শব্দের অর্থ-নৃত্য সহযোগে আরতি করা। সাহিত্যের অঙ্গনে আরতি করার মানসিকতায় আমরা দায়িত্ব নিলাম। সম্পাদক আমি প্রকাশক ডলি অর্থাৎ বসুশ্রী মিদ্যা। প্রথম ও দ্বিতীয় সংখ্যার সম্পাদকমণ্ডলী ছিল এইরকম, সম্পাদক-দুর্গাদাস মিদ্যা, উপদেষ্টামগুলী-তন্ময় মজুমদার, অনীক রুদ্র, প্রবালকুমার বসু, বিশ্বজিৎ রায়। তরী বাইতে লাগলাম। চলতে চলতে আজ পঁচিশে পা। কত জানা-অজানা লেখক, লেখিকা তাদের সৃষ্ট ফুলের ডালি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে আমরাও সযত্নে মালা বুনে তাদের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছি উপহার হিসেবে।
সন্তুষ্টির আদান প্রদান হয়েছে। দূরে যারা ছিল তারা কাছে এসেছে। একথা স্বীকার করতেই হবে যে ‘আরাত্রিক’ লিটল ম্যাগাজিনের অঙ্গনে একটি উজ্জ্বল এবং পরিচিত নাম।
যে কোন পথ চলার কষ্ট আছে, খরচ আছে, অনেক প্রস্তুতি থাকে। অর্থনৈতিক দায়দায়িত্ব আমরা কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম আমাদের ইচ্ছাপূরণ করে নিতে। দ্বিতীয়ত উৎকর্ষতা বৃদ্ধি করার জন্য নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়েছে। বিষয় নির্বাচনে অনেকেই পরামর্শ দিয়েছেন। সম্পাদকমণ্ডলী থাকলেও মূলতঃ আমাকেই সব কাজ করতে হয়েছে যেহেতু আমাদের সন্তান প্রতিম এই আরাত্রিক। সংসার চালাতে গেলে যেমন টাকা সরিয়ে রাখতে হয় তেমনি পত্রিকার ক্ষেত্রেও। ডলি যতদিন ছিল সু-গৃহিণীর মতো টাকার ব্যবস্থা করে রাখতো।
বিক্রি বাটাতে ডলির তুলনা ছিল না। বইমেলাতে টেবিলে ক্রেতা এলে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ডলি ঠিক তুলে দিত ক্রেতার হাতে। এতে কিছু টাকা ফিরে আসতো। মহামান্য প্রাবন্ধিক শিবনারায়ণ রায় বলে গেছেন-লোকসান লিটল ম্যাগাজিন মাত্রেই নিয়তি। মেনে নিয়েছি সে কথা। যখন পথচলা শুরু করেছি তখন পথের খরচ তো থাকবেই।
পত্রিকার ব্যয় বাড়ার সাথে পত্রিকার স্বাস্থ্যও ভালো হতে থাকলো। বছরে তিনটে করে বের হতে থাকলো। অসম্ভব আনন্দের আস্বাদন পেতে থাকলাম। লেখা পাওয়া নিয়ে কত মানুষের পরিচয়ে আবদ্ধ হলাম। এভাবে আমাদের এই বাংলায় আরাত্রিক ও দুর্গাদাস মিদ্যা প্রায় সমার্থক হয়ে গেল।
বিচারকদের স্বীকৃতিও পেলাম।যা খুব আনন্দের। প্রথম সম্মান পাই ২০২০ সালে সাহিত্য লহমা সম্মান। দ্বিতীয় সম্মান আসে বেহালায় প্রকাশিত "শ্লোক" পত্রিকা এদের ৫০বর্ষ প্রকাশ উৎসব উপলক্ষে, তৃতীয় সম্মান আসে হাওড়া থেকে প্রকাশিত 'মেটেফুল' সাহিত্যপত্র থেকে। সবশেষে-২০২১ ও সম্মানিত করলেন 'লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র'। এই প্রাপ্তি আরাত্রিক পত্রিকার কাছে এতটাই গৌরবের যা ভাষায় অপ্রকাশ্য।
লিটল ম্যাগাজিন করতে এসে আমি যেটা বুঝেছি তা হল নগণ্য এক ব্যক্তি থেকে আজ আমি সাহিত্য সাধনার একজন অগ্রগণ্য পথিক। আমার যতটুকু পরিচয় সবটাই এই লিটল ম্যাগাজিন করার সুবাদে। তাই ইহজীবনে
আরাত্রিক সাহিত্য পত্রিকা আমার ধ্যান এবং জ্ঞান, আজ যখন জানালা খুলে দেখি তখন এক আলোকিত উদ্ভাস আমার চোখে এসে পড়ে।
জানি অনেক পরিশ্রম ও অর্থব্যয়ে এই সাধনা, তবু সাধনা সাধনাই থাকে। এবং আমি মনে করি এই সাধনায় সম্পাদক হিসেবে আমার এই মোক্ষলাভ হয়েছে যে লিটল ম্যাগাজিন চর্চা সাহিত্য সাধনায় একটি মহৎ কাজ, এই মহতকাজে ব্রতী হয়ে নিজেকে ধন্য মনে হয়। এই আনন্দের মধ্যে দুঃখের ফন্তুধারাও আছে যেমন,তেমনি
সমস্যাও কম নয়--
ক)সময় মতো সংখ্যা বেরা করা, বিষয় নির্বাচন সময়োপযোগী ভাবনার প্রতিফলন। খ)সৌজন্য সংখ্যা প্রেরণ অথবা হাতে তুলে দেওয়ার নানা প্রকার সমস্যার সম্মুখীন হওয়া। গ)বিক্রয়কেন্দ্রের অপ্রতুলতা। ফলে পত্রিকা বাজারজাত করার পাহাড় প্রমাণ সমস্যা।
ঘ)অর্থনৈতিক সমস্যা। সব মিলিয়ে লিটল ম্যাগাজিন করা বেশ কষ্টের। এখানে লোকসান ছাড়া কিছু নেই। তবু উটের মতো কাটাগাছ খেয়ে রক্ত ঝরলেও সৃষ্টির নির্মল আনন্দে এই দুরূহ কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া।
আমাদের পত্রিকার বাৎসরিক অনুষ্ঠানে যেমন সাহিত্য সম্মেলন করা হয় তেমনি সাহিত্যের প্রতি উৎসাহ প্রদানের জন্য পুরস্কার প্রদান করা হয় যা একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ইতিমধ্যে 'আরাত্রিক' অবদান রেখেছে:--ক) ৫৮ জন বিশিষ্ট সাহিত্যিক, কবি ও প্রাবন্ধিককে 'আরাত্রিক সম্মান' জ্ঞাপন করা হয়েছে।
খ) 'ডলি মিদ্যা স্মৃতি পুরস্কার' দেওয়া হয়েছে ৩০ জন কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিককে এর সঙ্গে অর্থমূল্যও প্রদান করা হয়। যা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য ।
একটি বিষয় উল্লেখ না করে পারা যায় না তা হল আমরা বেশ কয়েকটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছি -
রামকিঙ্কর বেজ শতবর্ষ সংখ্যা, বিপন্ন মাতৃভাষা, বার্ধক্য বিষয়ক সংখ্যা, নানা ভাবে ও ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ, নেতাজী সংখ্যা, আশাপূর্ণ দেবী শতবর্ষ সংখ্যা,
কাব্যনাট্য সংখ্যা, সার্ধশতবর্ষে বিবেকানন্দ,যামিনী রায় শতবর্ষ সংখ্যা,শীত সংখ্যা, ভারতের বাংলা গল্প,ব্রজমাধব ভট্টাচার্য সংখ্যা, যুগলকিশোর দর্ত (ক্রোড়পত্র),কুয়েম্পু সংখ্যা, নলিনী বেরা সংখ্যা,বিপর্যয় সংখ্যা, রজত জয়ন্তী সংখ্যা ১ম পর্ব ও ২য় পর্ব সংখ্যা।
এই হল আমার লিটল ম্যাগাজিন করার জ্বালা যন্ত্রণা এবং যুগপৎ আশা, তাড়িত করে লিটল ম্যাগাজিনপত্রিকা সম্পাদনা করতে।






Comments
Post a Comment