ক বি -অ নু বা দ ক নী লা ঞ্জ ন শা ন্ডি ল্য
নীলাঞ্জন শান্ডিল্য
জন্ম:- ৩ মার্চ, ১৯৬৫ ।জামালপুর, বিহার, ভারতবর্ষ।পেশা - চাকুরি।কবি, ছড়াকার, প্রাবন্ধক, গল্পকার ও অনুবাদক।প্রকাশিত গ্রন্থ –বাংলা কবিতা – ক্যালাইডোস্কোপ, কমা সেমিকোলন ও দাঁড়ি, নিভৃতে নিজের সঙ্গে, কখনো রোদ কখনো ছায়া, আকাশ ছোঁওয়ার দুঃখসুখ।ইংরেজি কবিতা – Dream & Fire. ছড়া –ইলাটিন বিলাটিন।পুরস্কার – বনানী, ইস্ক্রা, নিত্যানন্দ পুরস্কার।
কবি হাইনরিষ হাইনে-র গীতি-কবিতার অনুবাদে কবি-অনুবাদক নীলাঞ্জন শান্ডিল্য
হাইনের পুরো নাম ক্রিশ্চিয়ান ইওহান হাইনরিষ হাইনে (Christian Johann Heinrich Heine)। তাঁর জন্ম ১৭৯৭ সালের শেষ মাসে জার্মানির ড্যুসেলডর্ফ শহরে। তিনি ছিলেন কবি ও আলোচক। তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে অল্প বয়সেই, বিশেষ করে তাঁর ‘দাস্ বুখ্ দেয়ার লীডার’ বা ‘গানের বই’-এর গীতিকবিতাগুলি প্রকাশিত হওয়ার পরেই। রবার্ট শুমান বা ফ্রান্স রুবার্টের মত দিকপাল সুরকারেরা এই সব গানে সুর দিয়েছিলেন। রোমান্টিকতার সঙ্গে তাঁর লেখার উপাদান ছিল ব্যঙ্গ ও শ্লেষ। রাজরোষের নির্বাসনে তাঁর জীবনের শেষ পঁচিশ বছর কেটেছিল পারিতে। তাই আরও কয়েকজন অ-ফরাসি মহাকবিদের মত তাঁর সমাধিও পারিতে।
বাংলায় তাঁর অনুবাদ কম হয়নি। তাঁর মৃত্যুর বছর দশেকের মধ্যে এডগার আলফ্রেড বাউরিং তাঁর রচনার যে ইংরেজি অনুবাটি করেন, তা খুব খ্যাতি পায়। আমরা দেখি তার দুই দশকের মধ্যে সে বই থেকে করা হাইনের বাংলা অনুবাদ আমাদের উপহার দিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। এর পর সুধীন্দ্রনাথ দত্ত হয়ে বিষ্ণু দে, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, অনুপম সেন এবং আধুনিকতর কবিরাও হাইনের অনুবাদ করেছেন। তাই এই অনুবাদকের হাইনে অনুবাদের দুঃসাহস পাঠকেরা নিজ গুণে মার্জনা করবেন। মূল জার্মান থেকেই অনুবাদগুলি করবার প্রয়াস পেয়েছি, তবে সাহায্যও নিয়েছি চালু ইংরেজি অনুবাদ থেকে। স্বাভাবিকভাবেই এই কাজের সময় পূর্বসূরীদের অনুবাদকর্মগুলি দূরে সরিয়ে রেখেছি। দুশো বছরের আগের হাইনের গীতিকবিতার আস্বাদন আনতে গিয়ে কবিতাগুলি ছন্দবদ্ধ ও সমিল করা হয়েছে। কোথাও কোথাও পুরনো বাগ্ভঙ্গিও এসে গেছে। তাঁর গীতিকবিতাগুলির মিলের ধরণ মূলত ক-খ-ক-খ – এই আদলে। ইংরেজ অনুবাদকেরাও যথাসাধ্য তা রাখবার চেষ্টা করেছেন। এই অনুবাদকও একটি ব্যতিক্রম বাদে তাই করেছে মূলের ব্যঞ্জনা কিছুটা হলেও আনতে গিয়ে। তবে ভাষান্তরে তো শুধু সুরটি রাখলেই হয় না, ভাবটিকেও রক্ষা করতে হয়। সেই খাতিরে কোথাও কোথাও বাঁধা নিয়ম থেকে একটু সরে যেতে হয়েছে। হাইনে সে কালের মানুষ হলেও তাঁর লেখা এখনও আধুনিক। পাঠকদের একটুখানি আনন্দ দিতে পারলেও আমার অনুবাদ সার্থক মনে করব।
লোরেলাই
বুঝি না কেন যে আমি এই
অকারণ বিষাদে মগন
ভুলতে পারি না কিছুতেই
যে রয়েছে জুড়ে এই মন।
পুরাণকালের কোনো মেয়ে
গুনগুন গান গেয়ে গেয়ে
এই দেহ-মন যেন ছেয়ে
চিরচেনা ব্যথার মতন।
শীতল বাতাস ঝিরিঝিরি
আকাশে ঘনিয়ে আসে কালো,
রাইন বইছে ধীরে ধীরে
পাহাড় চুড়োয় ঝিকিমিকি
ফুটে ওঠে গোধূলির আলো।
বসেছে রূপসী ঐ দিকে
রূপ তার বাখান না যায়।
সোনার গহনা ঝিকিমিকি,
সোনা রং কেশ আঁচড়ায়।
সোনার কাঁকন হাতে যার,
আনমনে কোন্ গান গায়?
মধুর মধুর সুর তার
শুনে প্রাণ করে হায় হায়।
নদীতে তরণী চলে বেয়ে
গানের নেশায় মন ভার
আনমনে দাঁড় টানে নেয়ে –
কোথায় হারালো মন তার।
কেবলই আকাশ দেখে চেয়ে
আসেনা নজরে ভাঙা পাড় –
সামাল সামাল, ওরে নেয়ে!
দেখ দেখ পাথুরে পাহাড়।
স্বপ্ন ভাসে তার দুটি চোখে
অবশ সুরের মুর্ছনায়,
ঢেউ বুঝি গিলে নেয় ওকে –
খুনে গান গায় লোরেলাই।
(হাইনের সর্বাধিক পঠিত কবিতাগুলির মধ্যে একটি এই কবিতাটি বুঝতে গেলে লোরেলাই শব্দটির অর্থানুষঙ্গ একটু জেনে নেওয়া দরকার। সমাসবদ্ধ লোরেলাই (lorelei)শব্দটি মূল অর্থ কলকলানি পাহাড়। রাইন নদীর ধারের এই পাহাড়টিতে খরস্রোতের আঘাত আর ছোট একটি ঝরণার ঝরে পড়ার শব্দ মিলে ঐ রকমের মৃদু ধ্বনি ওঠে, তাই এই নাম। হাইনের কালে সে ধ্বনি বেশ শোনা গেলেও এখন নগরায়ণের কারণে তা অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে। হাইনের আগেই এই ধ্বনি সৃষ্টিকারী এই ছোটো পাথরটি জন্ম দিয়েছিল এক কাব্যিক উপকথার। সেখানে লোরেলাই প্রেমে প্রতারিতা এক রূপবতী; সে নাবিকদের বশীভূত করে তার গানের জাদুতে। কবির কল্পনায় সেই সুর-জাদুতে মোহিত মাঝির নৌকো ঐ পাহাড়ে আছড়ে পরে।)
দোসর
এখন রাত নিশ্চল পথেরা বিশ্রামে
বাড়িটি সেই দাঁড়িয়ে আর আমার সোনামণি
কবেই গেছে অচেনা কোন্ গ্রামে
শহর সেই; বাড়িটি ঠায় দাঁড়িয়ে ঐখানে।
একটি লোক ভূতের মত দাঁড়িয়ে চৌকাঠে
হাত দুটোকে মুচড়ে নেয় তার
নিংড়ে দেয় যেন মনের ভার
আঁধারি রাত, বুকটা কেঁপে ওঠে।
চাঁদের আলো! ওটা ও কার মুখ?
আমারই যেন! দোসর বল্ দেখি
এ মনব্যথা অনুকরণে তোর
কী হল লাভ? আমার বুক সেকি
ক্ষণকালের যাতনে কাঁদে বল্
বুক ছাপিয়ে গুমরে ওঠে ঐ
কত কালের চোখ ছাপানো জল।
একখানা ফার গাছ, একা
একখানা ফার গাছ, একা
ন্যাড়া এক উত্তুরে পাহাড়।
তুষার হিমানী দিয়ে ঢাকা
রুপো-কম্বল মুড়ি, ঘুম।
স্বপ্নে স্মরণে আসে তাকে
নারিকেল, দূর পুব দেশে
চোখ তার ছলছলে, একা
ঝলসানো বালুপট, চুপ।
স্বর্গে বিশ্বাস নেই কোনো
আমার বিশ্বাস নেই সুরসুধালোকে
পাদরিরা সারাদিন যার গান গায়;
আমার প্রত্যয় ঐ ডাগর দু-চোখে
আমার ও পথে অমরার পথ যায়।
আমার বিশ্বাস নেই ঈশ্বর বিষয়ে
পাদরিরা সারাদিন গায় যাঁর গীতি;
আমার বিশ্বাস শুধু তোমার হৃদয়ে
আর কোনো ঈশ্বরে নেই রে প্রতীতি।
আমার বিশ্বাস নেই কোনো শয়তানে
নরকে বা নরকবাসের যন্ত্রণায়
আমার বিশ্বাস শুধু ও দুটি নয়ানে
আমার বিশ্বাস তোর কপট আত্মায়।
ভুলতে তোকে পারছি না রে রানি
ভুলতে তোকে পারছি না রে রানি
আহা রে সেই জড়িয়ে ধরা সুখ
ছিলিস তো তুই আমারই সবখানি
সবটা শরীর, মনেরও সবটুক।
আজও তিয়াস ঐ শরীরের তরে –
দিক না কবর পড়শিরা সব্বাই।
আমার হৃদয় যথেষ্ট সে বড়
কুলিয়ে যাবে ঠিক দুজনের ঠাঁই।
আমার আত্মা নেব টুকরো করে
আমার শ্বাসেই মেশাবো তোর শ্বাস।
শান্তি পাব ফের জড়িয়ে ধরে
এক দেহ-মন, একই ঘরে বাস।
কোথায়?
আজ আমি ক্লান্ত বড় ঘুরে ঘুরে ঘুরে
শেষের বিশ্রাম আছে কে জানে কোথায়?
নারিকেল ছায়া ঘেরা দেশে, বহুদূরে?
রাইনের তীরে নেবু গাছের তলায়?
অথবা কি ছায়াহীন কোনো মরুভূমি?
গোর নেব অচেনা লোকের দ্রুত হাতে?
অথবা হয়ত কোনো পরিচিত জমি
সাগরের তীরে চেনা বালুকা-বেলাতে।
কী বা আসে যায় তাতে? তাঁর মেঘছায়া
ওখানে এখানে সবখানে এসে পরে
তারার মরণ আলো ঝিকমিকে মায়া
চিরদিন আলো দেবে আমার কবরে।
(পারির মঁমাত্র (Montmartre)গোরস্থানে তাঁর সমাধিতে কবিতাটি উৎকীর্ণ করা আছে।)


Comments
Post a Comment