ক বি - প্রা ব ন্ধি ক বি ম ল ম ন্ড ল

বিমল মন্ডল

জন্ম:-পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার খেজুরী  থানার -চৌদ্দচুলী  গ্রামে।অভাব তাঁর নিত্য সঙ্গী।মায়ের অভাবের সাথে যুদ্ধ করে বড়ো  হওয়া। মা- ই ছিল  তাঁর  জীবন দর্শন। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে  তিনি স্কুল জীবন শেষ করে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়  থেকে  এম.এ পাশ করেন। লেখার নেশা স্কুল  জীবন  থেকে। তাঁর  প্রিয় নেশা বই পড়া এবং  নিম্নবর্গের  মানুষের  শিক্ষা,সংস্কৃতি ও ভাষা সংগ্রহ  করা। তিনি বর্তমানে  পূর্ব মেদিনীপুর  জেলার নন্দীগ্রাম  থানার অন্তর্গত  আশদতলা  বিনোদ বিদ্যাপীঠ  (উচ্চমাধ্যমিক) স্কুলের  সহকারী  শিক্ষক । তাঁর রচিত  উল্লেখযোগ্য  কাব্যগ্রন্থ গুলি  হলো —অর্পণ, ফিরে পাওয়া কবিতা, শিরোনাম নেই, আকাশ তুমি জানো, বিশ্বাসের চুপকথা, বৃষ্টি আজ মেঘের আড়ালে,সরোবরের ভেতর চাঁদ,কথা,রোদের কোন অক্ষর নেই, সম্পাদিত গ্রন্থ-শব্দ যখন...। সম্পাদিত পত্রিকা-অঙ্কুরীশা।প্রবন্ধ- কাজী নজরুল ইসলাম ;প্রসঙ্গ কবিও কাব্য। এছাড়া অজস্র  বড়ো ও  লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ প্রকাশিত।     

©\কবির সঙ্গে কবিতার সঙ্গে...

















বিকাশ চন্দের কবিতা :প্রসঙ্গ ভাবনা ও শপথ
কবি-প্রাবন্ধিক বিমল মন্ডল

'অজ্ঞাত সময় গোনে অপেক্ষার কাল


অপেক্ষাতেই আছে না চেনা  সেই একটা সকাল,

কিছু ছিল অন্য মুখ, কথা ছিল—


নড়ে উঠেছিল দুটো ঠোঁট—'


সত্তর দশকে প্রতিবাদী এক গ্রাম্য কবি যাঁর জন্ম হয়েছিল পূর্ব মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত খেজুরী থানার কামারদা গ্রামে। তিনি এক অতি নিম্নবিত্ত পরিবার জন্মেছিলেন। ১৯৭৩ এর ডাক বিভাগে মাত্র ৩০ টাকা মাসিক ভাতা নিয়ে কাজ শুরু করেন। সেই কাজের অবসরে খবরের কাগজ বিতরণ, ঠিকা মজুরিতে  দোকানে কাজ। পেটের টানে দিনমজুরি করা। পরবর্তীকালে ডাক বিভাগে পাকাপাকি চাকরি পান। লেখা শুরু করেন সম্ভবত হাজার ১৯৬৯ থেকে। তারপর থেকে তিনি লিটল ম্যাগাজিনে ও কিছু বড় পত্রিকায় লিখতে শুরু করেন। তাই তিনি গ্রামের হলেও তার প্রতিটি লেখার মধ্যে সমাজ-ভাবনা রাজনীতি চেতনা প্রভৃতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ধরা পড়েছে।

তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ গুলি হল—বীজে অঙ্কুর বিনষ্ট শিকড়ে, বর্ণহীন বর্ণবিকাশ,

ঋতুবদলের ছবি, আকাশগঙ্গা, অনুচ্চারিত শব্দের কোলাহল, সাদা ফুলের কফিন, হৃদয় বাঁচে আত্মার আড়ালে।

এছাড়া আর একটি কাব্যনাট্য প্রকাশিত হয়েছে সেটি হল 'ঝিনুকের চোখে  মুক্তা জল।'


'কেউ জানে না বুকের ভেতর জানে সে মন্দ রাত'


এভাবে জানার যে উৎসাহ সমস্ত শরীর জুড়ে তা এই সত্তরের কবি বিকাশ চন্দের কবিতার অস্থিরতায় ঘোরে।আমিও জেনেছি কাব্যগ্রন্থগুলির কাছে।


আমার ক্ষেত্রে তাঁর পাঠ শুরু হয়েছিল "শূন্য শরীরে স্তপতির হাত'' কাব্যগ্রন্থ দিয়ে।তবে আমি যে তাঁর  কবিতায় গভীর মনোনিবেশ করতে পেরেছি তা নয়।

কারণ তিনি আমাকে প্রতিটি বই পাঠক হিসেবে উপহার দেন।কিন্তু  আমি সবসময় না পড়লেও প্রায়শই তাঁর কবিতাগুলো পড়ি।আমার কর্মজীবনের ফাঁকে ফাঁকে সময় তা আমাকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয় যে প্রতিদিন  কবিতা যাপনে ধৈর্য আনে।আমি তাই পাই। কবিতা আমার কাছে ঈশ্বর সাধনা,কবিতা আমার কাছে শান্তি। যে কোন কবিতা আমাকে বহুরাত অবধি সঙ্গ দেয়।কখনো কখনো তাঁর কবিতাও আমাকে টেনে নিয়ে যায় গভীর রাতে। আমি মিশে যাই কবিতার সাথে। 


'চুপচাপ জড়সড়  একটাই সুখ ছত্রছায়া 

নিস্তরঙ্গ আবহমান পরিচিত স্থির রাজন্যবর্গ

পথঘাট টলমল জনপদ —'


এমন ভাবনা সমস্ত পাঠকের জীবন বদলে দিতে পারে।আমিও  এই সুর ও শৈলিতে হারাতে শুরু করলাম।বদলে দিয়েছে তাঁর  কবিতার সুখছায়ায়।


বারবার কবি বিকাশ চন্দের কবিতায় খুঁজে পাই কখনো জীবনানন্দের ছায়া আবার কোথাও খুঁজে পাই কবি শঙ্খ ঘোষকে। আসলে প্রতিটি প্রজন্মের কাছে যেমন অস্থিরতা আছে, তেমনি বড় হওয়ার সাথে সাথে বিশ্বজুড়ে নানান আন্দোলনের যে সাক্ষী আমরা তা বিকাশ চন্দের বেশ কয়েকটি কবিতায় ধরা পড়ে।যেমন-


'আপনার চতুর্দিকে যত অবিনাশী আন্তরিক অনুভব, 

...........................................

নির্বিবাদী হাসিমুখ ঝলসায়, থম মেরে বসে থাকে ক্রোধ। '


আমি বিকাশ চন্দের  বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ পড়েছি, প্রসঙ্গ নানাভাবে। আমার কবিতা লেখার ধার হয়তো তেমন নেই, তবে বর্তমান বাংলা সাহিত্যে যাঁরা  কবিতা লিখে চলেছেন, আমার চোখে বিকাশ চন্দ তাঁদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। বিকাশ চন্দের কবিতা পড়ে   আমিও একটা দিশা দেখতে পাচ্ছি। আমি আমার মতো করে যখন কবিতা লিখছি, তখনই চলে আসে বিকাশ চন্দের কবি ভাবনার বিভিন্ন প্রসঙ্গ।কোথাও যেন আমার অগোচরে আমাকে তাঁর কবিতার গভীরে নিয়ে যায়।যখন পড়ি,-

'দিব্যি পায়ে পায়ে কাদা মাটি জল শরীরে দোল খায়

সগর্ভ ভিখারিনীর চোখে টলমল ছায়া'।


তখন বুঝতে পারি, এই গভীর অনুভূতি। আমার  সাধ্য নেই এমন বলার,তবুও পড়ি,--


'শরীরে ভাষা জানা ছিল না

আগুনও কি তাও জানত - চোখ, মুখ, বুক, হাত, পা।'


এখানেই যেন সেই ভাষা কে খুঁজে পাই আর প্রশ্ন করি,-


'শব সাধনার জেরে প্রাণহীন কঙ্কাল নাকি জাগে'


এখানে কি নতুন ভাষা পাওয়া যায়?


আশ্চর্য অক্ষর সাধনায় কবি এই বয়সে এসে ধ্যান করছেন আর নতুন শব্দ সন্ধানে মেতে উঠেছেন।আমিও   তাঁর বেশ কিছু কবিতায় ভবিষ্যৎ পথের দিক খুঁজে পাই। যেমন- 'আকাশ ধরেছে,বাউল,জন্ম— মৃত্যু প্রেম,'দহন পাগল',পুরোনো অক্ষরে গান', 'দগ্ধ বাসনা' প্রভৃতি  কাব্যের কবিতায় সময়ের অনুরণন ঝরে। আমি বুঝতে পারি এমনই কবিতা ভবিষ্যৎকে ইঙ্গিত দিতে পারে। 


এই কবি হয়তো  বাংলা সাহিত্যে  অন্যান্য কবিদের মতো  তাঁর কাব্যগ্রন্থের জন্য বড় বড় পুরস্কার পায়নি ঠিকই। তবে আমাদের পূর্ব মেদিনীপুরের এমন অনেক কবি ও সাহিত্যিক আছেন যা বাংলা সাহিত্যের উদাহরণ হিসেবে কোনো  অংশে কম নয়।তেমনই  এক উদাহরণ বিকাশ চন্দ। 


আমি কবিতা পড়ি কলকাতার নামি-দামি  কবিদের যাঁরা  সরকারি পুরস্কারে পুরস্কৃত। সেইসব  কবিতার  চেয়ে আমাদের মতো গ্রামের কবিদের কবিতায় কোথায় পার্থক্য বুঝতে পারি না।তবুও আমরা ব্রাত্য হয়ে থাকি। আমরা দিশা কিন্তু হারিয়ে ফেলি না।কারণ লিটল ম্যাগাজিন আমাদের স্বপ্ন।সেই আশা নিয়ে হয়তো  বিকাশ চন্দ কত সময় যাপন করে পথ হেঁটে  চলেছেন। আমিও সেই পথের  যাত্রী মাত্র।তাই তাঁর কবিতায় বোঝা যায় প্রতিবাদী স্ফুলিঙ্গের আয়োজন—


'কিন্তু মানুষ এদিক ওদিক দাঁড়িয়ে ঠাঁয় গাছ

খস খস পাতার শব্দ নিরুত্তাপ বারুদের শ্বাস।'


এ যেন এক জিজ্ঞাসা রেখে দিয়ে যান।

তাঁর 'বিষণ্ণ দ্রোহকাল 'কাব্যগ্রন্থে কলমে যেন প্রগাঢ় অভিলাষ ধরা পড়েছে।যেমন- 

"এখন দিনরাত ঘর্ঘর চেন টানার শব্দে/নেমে আসে আস্ত কালো রাত/এদিকে মানুষ মারো অদিকে ফানুস ওড়াও/সাদা ঘর থেকে একটা সাদা কঙ্কালের/খুটখাট আস্ফালন যুদ্ধের হুকুমনামা। "


এমনই ইতিহাস  আমরা দেখে আসছি কালে কালে। এমন শব্দ যোগ আমাকে টেনে নিয়ে যায় আমাকে বহু কবিতা।'শূন্য শরীরে স্তপতির হাত' কাব্যগ্রন্থের 'নিমলজ্জা' কবিতায় তিনি লিখেছেন,


'ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে ক'টা ঘর

দরজা খোলা, খোলে দরজার মুখ

বাহার গাঙের নোনা জলের স্বাদে মগ্ন শরীর।'


এমন উচ্চারণ বুঝিয়ে দেয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের  অন্ধ দিশাকে। আসলে বর্তমান সমাজে এমন কত প্রশ্ন  দেখা দেয়, কতটা তার পূরণ হয়।আমিও  বিকাশ চন্দের কবিতার খুঁটিনাটি অর্থ খুঁজে , কিছু পাই, কিছু পাই না। তবুও পড়ি অর্থ বোঝার চেষ্টা করি। আর যতটুকু বুঝতে পারি, ততটুকুই সংযমের কথা ভাবি।বিস্ময় বাড়ে কবিতায় দীর্ঘ বিবৃতিতে। এখানে মনে পড়ে আমার প্রিয় কবি শঙ্খ ঘোষের কথা।অবশ্যই তা স্বাভাবিক  কারণ তিনিই বলতে পেরেছেন, 


"তোমাকে  বকব,ভীষণ বকব

আড়ালে।''


এখানেই যেন তাঁর বাস্তব শিল্প ভাবনার রূপ খুঁজে পাই।


এভাবেই কবিতাকে পর্যালোচনা করা আমার পক্ষে হয়তো কঠিন তাই সময়ের সাথে সাথে কত কবিতা রচিত হয় আবার হারিয়েও যায়।সে সব ইতিহাস সাক্ষী। বিকাশ চন্দের কবিতায় এই  সময় ও সময় সময় কালের কথা উঠে এসেছে।আমি তা কিছুটা হলেও  অনুধাবন করতে পারি।  তিনি লিখেছেন —


জীবন নাকি দরজা খুলে সামনে দাঁড়ায় 

পেছন থেকে কষ্টগুলো হাতটা বাড়ায়

সামনে আবার ফিরে যাওয়ার উৎসমুখ

সূর্য একা দাঁড়িয়ে আছে অগ্নিদাহ মুখে।


এই কবিতাপাঠ যেন এক জিজ্ঞাসা রেখে যায়। আমি আপাতত ভাবে কবির বেশকিছু কবিতার শিরোনাম নিয়ে ভাবি যেখানে মানব বোধের পরিচয় মেলে।যেমন- ' খোদাই করা মূর্তিমতি চাঁদ',' নৌকো ঘর',' দ্রোহকালে

সবাই সাবালক' ,'অকাল তর্পণ ','দরজা আগলে তুমি'

'জন্মমোহ','চেনা মানুষের ছায়া','জন্মান্তর' প্রভৃতি  কবিতায় তিনি কখনো রাজনীতি, কখনো নীরবতা, কখনো  প্রতিবাদে  সোচ্চার হয়ে ওঠেন।আমি তাঁর  কবিতায় সেই চর্চা দেখতে দেখতে আমরা তরুণরা ভাবি এই সময়ের বিকাশ চন্দের  সময় ভাবনার কথা।


আমি আমার কবিতা চর্চার মাঝে বিকাশ চন্দের  জীবন ও কবিতাকে এক সাথে মিলিয়ে ফেলি।আসলে বিকাশ চন্দ সারাজীবন তাঁর  কর্মজীবনের সাথে সাথে তিনি যে নতুন নতুন শব্দ মিশিয়ে  গ্রাম বাংলার কথা, প্রকৃতির কথা,নির্জনতার কথা, প্রতিবাদী কথা পথের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন তা তরুন প্রজন্মের কাছে শপথ মাত্র।






Comments

  1. অনবদ্য সংখ্যা উপহার দেওয়ার জন্য অনেক অনেক অনেক অনেক অনেক অনেক অনেক শুভেচ্ছা

    ReplyDelete
  2. সুন্দর আলোচনা, সমৃদ্ধ হলাম। প্রিয় কবি ও আলোচককে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা অফুরান।

    ReplyDelete
  3. সুন্দর বিশ্লেষণে ঋদ্ধ হলাম। মাননীয় কবি ও কবিতার বিশ্লেষণকারীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানাই।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ক বি- শি ল্পী শ্যা ম ল জা না

ক বি সু দী প্ত বি শ্বা স

ক বি রা খ হ রি পাল